মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্বল্পতায় করোনা পরীক্ষায় হিমশিম

আন্তর্জাতিক করোনাভাইরাসে বাংলাদেশ
Spread the love

বাংলাদেশ

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্বল্পতায় করোনা পরীক্ষায় হিমশিম

করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশি বেশি পরীক্ষার উপর জোর দিলেও এ কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ৷

default  

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস যেখানে উন্নত দেশেগুলোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে৷ সেখানে বাংলাদেশের মত নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে৷

এই সংকট মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চাহিদাপত্র পেয়ে এরই মধ্যে দুই হাজার চিকিৎসক ও পাঁচ হাজারের বেশি নার্স নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকারি কর্ম কমিশন-পিএসসি৷ কিন্তু সেই চাহিদাপত্রে নেই মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কথা৷

অথচ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ছাড়া করোনা ভাইরাস মোকাবেলার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নমুনা সংগ্রহ ও তা পরীক্ষার মাধ্যমে আক্রান্তদের শনাক্তের কাজটিই করা যাবে না৷

বাংলাদেশে ডয়চে ভেলের কনটেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে এভাবেই নিজের মত প্রকাশ করেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন৷

তিনি বলেন, ‘‘সরকার চিকিৎসক-নার্সের সংখ্যা বাড়াচ্ছে ভালো কথা৷ কিন্তু মেডিকেল টেকনোলজিস্টও নিয়োগ দিতে হবে৷ আমরা টেস্টের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছি, কিন্তু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ছাড়া স্যাম্পল কালেকশন কে করবে? এটা তো অপেশাদার লোকদের কাজ না৷’’

বাংলাদেশ এখনও কোভিড-১৯ রোগের নমুনা পরীক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পিছিয়ে আছে৷

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার কথা৷ কিন্তু বাংলাদেশের চিত্রটি পুরো উল্টো৷ গত ২১ মার্চের হিসাব অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে ২৫ হাজার ৬১৫ জন চিকিৎসক কাজ করছেন৷ ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী, এক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদের সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল এক লাখ ২৮ হাজার ৭৫টি৷ কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদই আছে সাত হাজার ৯২০টি৷ এর বিপরীতে কর্মরত আছেন আরও কম, পাঁচ হাজার ১৮৪ জন৷ প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য শূন্য দশমিক ৩২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কাজ করছেন৷

আর ল্যাব টেকনোলজিস্টের দুই হাজার ১৮২টি পদের মধ্যে এক হাজার ৪১৭ জন কর্মরত আছেন৷ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটি করেন ল্যাব টেকনোলজিস্টরাই৷

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন জেলা থেকে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের প্রেষণে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়৷ ফলে জেলাগুলোয় নমুনা সংগ্রহ করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে৷

বিভিন্ন জেলা এমনকি নারায়ণগঞ্জেও অনেকে অভিযোগ করেছেন, নমুনা সংগ্রহের জন্য হটলাইনে ফোনের পর ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায় না৷ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের পর সবচেয়ে আক্রান্তের এলাকা গাজীপুরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছেন ১৭ জন৷ এর মধ্যে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে চারজন এবং হাসপাতালে সাতজন৷ প্রত্যেকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন করে এবং টঙ্গীতে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট৷

সব থেকে ঝামেলায় আছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মীরা৷ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন টেকনোলজিস্ট বলেন, তাঁকে দৈনিক ২৫ থেকে ৩৫টি নমুনা সংগ্রহ করতে হয়৷ এজন্য দুজন সহযোগী নিয়েছেন তিনি৷ তারা রোগীর নাম ঠিকানা লিখে দেওয়া থেকে প্রাথমিক কিছু কাজ করে দেয়৷

‘‘নমুনা সংগ্রহের কাজটা আমিই করি৷ কিন্তু প্রতিদিন এতগুলো নমুনা সংগ্রহ করতে জান বাইর হয়ে যায়৷ গাজীপুর জেলায় তো অনেক রোগী, সবার স্যাম্পল নেওয়া সম্ভব হয় না৷’’

নরসিংদীর পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দিলীপ কুমার দাস জানান, উপজলায় কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে৷ ফলে কন্টাক্ট ট্রেসিংসহ নানা কাজে তাকে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়৷ এখানে দুজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের একজনকে ঢাকার একটি হাসপাতালে প্রেষণে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷

‘‘আমিই বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করি৷ আবার আমাকেই দৌড়াতে হয় হাসপাতালে৷ বিষয়টি নিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে৷’’

একই অবস্থা নরসিংদীর বাকী উপজেলাগুলোতেও৷

ঢাকার একটি গবেষণাগারে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় নিয়োজিত একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নতুন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগকে স্বাগত জানালেও মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা উপেক্ষিত থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, ‘‘ডব্লিউএইচওর গাইডলাইন অনুযায়ী ২ হাজার চিকিৎসকের বিপরীতে ১০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ পাওয়ার কথা৷ কিন্তু দুঃখজনক হল তারা আলোচনাতেই নেই৷’’

বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে দেশে ৩০ হাজার ৬৭ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছেন৷

সংগঠনের সভাপতি আলমাস আলী খান জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা ঝুঁকি নিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করছেন৷ কয়েকটি হাসপাতালে সংক্রমণের পর চিকিৎসক-নার্সরা কোয়ারান্টিনে গেলেও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের পাঠানো হচ্ছে না৷

‘‘কারণ টেকনোলজিস্টরা কোয়ারেন্টিনে গেলে সেখানে কাজ করার কেউ থাকে না৷’’

তিনি বলেন, সাময়িকভাবে কিছু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিলেও এই পরিস্থিতিতে কাজ করা কিছুটা সহজ হবে৷

পরিস্থিতি বিবেচনায় ১২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. বেলাল হোসেন৷

কিন্তু অচিরেই এই নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান খান৷

তিনি বলেন, ‘‘সরকারের পে-রোলে কাউকে আনতে হলে সিস্টেমের মধ্যে আনতে হয়৷ টাকা পয়সারও ব্যাপার আছে৷ ওটা (টেকনোলজিস্ট নিয়োগ) এখনও চিন্তাভাবনার মধ্যে আছে৷ এখনও প্রসেস শুরু হয়নি৷’’

বর্তমানে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘‘অনেক জায়গায় চিকিৎসকেরাও নমুনা সংগ্রহ করছেন৷ স্বাস্থ্যকর্মীরাও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শুধু নমুনা সংগ্রহ করছেন৷ নমুনা সংগ্রহ কাজে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না৷’’

এসএনএল/কেএম (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *